Home / সাক্ষাতকার / রাজধানীর পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব

রাজধানীর পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব

নয়ন রায় ঃ রাজধানীর পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব পালিত। প্রাচীনকাল থেকেই পৌষকে বিদায় জানাতে মাঘ মাসের প্রথমদিন পুরান ঢাকাইয়াদের ঘুড়ি উড়ানো একটি যেন ঐতিহ্য। শীত ঋতুর প্রথম মাস পৌষ মাস শেষ হয়ে এল মাঘ মাস। পৌষ মাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে শীতের তীব্রতা । শনিবার সকাল থেকে গান বাজনার তালে তালে শুরু হয় ঘুড়ি উড়ানোর উন্মাদনা। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে মুখরিত হয় প্রতিটি বাড়ির ছাদ। আজ বাঙালি সমাজে বিশেষত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি-ঘরে পিঠা-পুলির উৎসব চলছে। বাহারি শীতের পিঠায় বরণ করে নেয়া হচ্ছে মাঘকে। গ্রামগঞ্জের পাশাপাশি শহুরে জীবনেও এই পিঠা পার্বণের আমেজ একেবারে কম নয়। এরই ধারাবাহিকতায় মাসের প্রথম দিনটিতে পুরান ঢাকায় । শুধু পুরান ঢাকায়ই নয়, এ উৎসব এখন গোটা দেশেও বলা যেতে পারে। কি সমুদ্র সৈকতে, কি বান্ধবীদের নিয়ে ছাদের উপর যেকোনো স্থানেই ঘুড়ি উৎসবে পরিণত হয়। একে সাকরাইন বা পৌষ সংক্রান্তিও বলা হয়। আগে এ উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরান ঢাকায় উৎসবে পালিত হয় এ দিনটি। উৎসবে অংশ নেন সব ধর্মের সব বয়সী মানুষ। পুরান ঢাকার গোয়াল নগর, নয়া বাজার, তাঁতি বাজার, লক্ষ্মী বাজার, শাঁখারি বাজার,গেণ্ডারিয়া, মুরগীটোলা, ধূপখোলা, দয়াগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, কাগজিটোলা, বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কলতাবাজার, ধোলাই খাল, নারিন্দা, রায়সাহেব বাজার, সদরঘাট এবং লালবাগ এলাকার মানুষ এ উৎসবে দিনব্যাপী ঘুড়ি উড়ান। আয়োজন করেন নানা খাবারের। এছাড়া সন্ধ্যায় আগুন নিয়ে খেলা, আতশবাজী ফোটানো এ উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। সকাল থেকেই ছাদে ছাদে শুরু হবে ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। ছোট বড় সবার অংশগ্রহণে মুখর হবে প্রায় প্রতিটি বাসার ছাদ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে উৎসবের জৌলুস। আর আকাশে বাড়বে ঘুড়ির সংখ্যা। এই দিনকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার আশপাশের অলিগলিতে বিভিন্ন ঘুড়ির দোকান ও মেলা বসে থাকে। এছাড়া প্রতিটি ঘুড়ি ৮ থেকে ১০ টাকা করে বিক্রি করা হয়। তবে সূতার দাম ছোট বান্ডিল হলে ৮০ টাকা আর বড় বান্ডিল হলে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। সকালের তুলনায় বিকেলে এ উন্মাদনা পরিপূর্ণতা লাভ করে। ছাদের উপর চলবে গানবাজনা আর খাওয়া-দাওয়া। সে সঙ্গে আনন্দের উত্তাপকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয় ঘুড়ির কাটাকাটি খেলা। পুরো আকাশ এক ধরনের রংধনুর মতো বিভিন্ন রঙে রঙিন করা হয়। এছাড়া ঘরে ঘরে তৈরি হবে মুড়ির মোয়া, বাখরখানি আর পিঠা বানানোর ধুম। বর্তমানে এ উৎসবে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। অর্থাৎ সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় আতশবাজি ও ফানুস উড়ানো। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব এলাকায় চলেছে আতশবাজির খেলা। পুরান ঢাকার রীতি অনুযায়ী ঘুড়িউৎসবে শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেয়া হয়। এবং পিঠার ডালা পাঠানো একটি অবশ্য পালনীয় উৎসবের অঙ্গ হয়ে উঠে। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হয় আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়ার লোকদের মধ্যে। উৎসবকে মাথায় রেখে টানা এক সপ্তাহ পুরান ঢাকার বায়ান্নো বাজার তেপ্পান্ন গলির অধিকাংশ গলিতে আর খোলা ছাদে লেগেছে সুতা মাঞ্জা দেয়ার ধুম। ডিজিটাল ছোট ছোট ও হেলোজেন লাইটে সজ্জিত করা হয় প্রতিটি বাসার ছাদ। কুয়াশা ভেজা শীতে পৌষ সংক্রান্তিকে উদযাপনের প্রস্তুতি। ১৭৪০ সালের এই দিনে মোঘল আমলে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমলে ঘুড়ি উড়ানো হয়। সেই থেকে এই দিনটি কেন্দ্র করে বর্তমানে এটি একটি অন্যতম উৎসব ও আমেজের  পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ না রেখে সকলে এই উৎসব পালন করে থাকেন। দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করে পুরান ঢাকাইয়ারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার আকাশে সারাদিন বিভিন্ন রঙের হাজার হাজার ঘুড়ি উড়তে দেখা গেছে। ছোট-বড় সকলে এমনকি অভিভাবকরাও এই দিনে শখের বসে ঘুড়ি উড়িয়ে থাকেন। দিনব্যাপী এই ঘুড়ি উড়িয়ে নিজের মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তির স্বাদ গ্রহণ করেন তারা। এভাবেই পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করলেও তারাও এই দিনকে কেন্দ্র করে সাকরাইন উৎসবে অংশ নেন। সাকরাইন পুরান ঢাকার প্রাচীন ঐতিহ্য। পূর্বপুরুষেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আয়োজন করে আসছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Designed, Developed & Hosted by themekiller.com